গালি দেয়া, তিরস্কার করা, ধমক দেয়া, অপমান করা, ব্যঙ্গ করা, শাসন করা... এগুলোর ভেতর পার্থক্য আছে।

গালি দেয়া, তিরস্কার করা, ধমক দেয়া, অপমান করা, ব্যঙ্গ করা, শাসন করা... এগুলোর ভেতর পার্থক্য আছে।


[1] ইসলামে শুধু অপমান বা গালির কারণে কাউকে মারধর করা বৈধ নয়, তবে জালিমের বিরুদ্ধে বদদোয়া বৈধ তবে উত্তম নয়, খারাপ শব্দ ব্যবহার না করে অপমানের জবাব অপমান দিয়ে করা বৈধ তবে উত্তম নয়, প্রতিশোধের দোয়া করা বৈধ কিন্তু উত্তম নয়।


> বড়োদের তুই তুকারি করা জায়েজ নয়, যদিও সে অন্যায়কারী হয়ে থাকে।


[2] অন্যায়কারীকে নিয়েও ব্যঙ্গ করা নিষেধ।


[3] তিরস্কার ও কুটুক্তি করা এক নয়। তিরস্কার অনেক ক্ষেত্রে জায়েজ, কিন্তু কুটুক্তি কোনো ক্ষেত্রেই জায়েজ নয়।


[4] কোনো ছোটো বাচ্চা যদি বেশি দুষ্টুমি করে ইসলাম অনুযায়ী কি তাকে মারা যেতে পারে? (না)


[5] স্ত্রীকে কি মারা যেতে পারে? (না)

____________________________________________________

কেউ যতোবারই আপনাকে গালি বা অপমান করুক না কেন, কেবল মুখের কথার জবাবে মারধর করা ইসলাম অনুযায়ী বৈধ নয়। এভাবে হাত তোললে আপনি নিজেও গোনাহে লিপ্ত হবেন।


কুরআনে আল্লাহ বলেন, "আর ভালো কাজ ও মন্দ কাজ সমান নয়। তুমি মন্দকে সেই উত্তম পদ্ধতিতে প্রতিহত করো—তাহলে দেখবে যার সাথে তোমার শত্রুতা আছে সে যেনো অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে যাবে।" — (সূরা ফুসসিলাত ৪১:৩৪)


[] রাসূল ﷺ–এর সহনশীলতার শিক্ষা:


রাসূলুল্লাহ ﷺ–কে মক্কার কাফিররা বহুবার গালি দিয়েছে, অপমান করেছে, এমনকি আবর্জনা ফেলে দিয়েছে। কিন্তু তিনি কখনো প্রতিশোধ নেননি। তিনি ধৈর্য ধারণ করেছেন এবং সাহাবিদেরও ধৈর্যের দিকে উৎসাহিত করেছেন। (প্রতিশোধ নেয়া যদিও জায়েজ: "যদি কেউ অন্যায় করে, তবে তার জন্য সমতা অনুযায়ী প্রতিকার আছে, কিন্তু যারা ক্ষমা করে, তাদের জন্য আল্লাহ প্রাপ্তি আরও উত্তম।" — সূরা আল–মায়িদা (৫:৪৫), অর্থাৎ, প্রতিশোধ নেয়ার আইন অনুযায়ী সীমিত, এবং ক্ষমা ও সহনশীলতা উত্তম।)


তিনি বলেছেন, "মুমিনদের মধ্যে সে-ই উত্তম, যে মানুষের সাথে মিশে এবং তাদের কষ্ট সহ্য করে।"

— (সুনান আত-তিরমিজি, হাদিস ২৫০৭; সহিহ)


[] নবি ﷺ সাধারণত অভিশাপ দিতেন না:


সাহাবারা বলেন, "রাসূলুল্লাহ ﷺ কখনো অশ্লীল কথা বলতেন না, অভিশাপ দিতেন না, গালি দিতেন না।"

— (সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৬০৩১)


> একবার সাহাবিরা অনুরোধ করেছিলেন,

"হে আল্লাহর রাসূল, মুশরিকদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করুন।"

তিনি উত্তরে বললেন, "আমি লানত দেয়ার জন্য প্রেরিত হইনি; বরং রহমত হয়ে প্রেরিত হয়েছি।"

— (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৯৯)


[] তবে জালিমের বিরুদ্ধে বদদোয়া বৈধ:


ব্যক্তিগতভাবে কারো নাম ধরে ধরে লানত করা রাসূল ﷺ করতেন না। তবে সাধারণভাবে জালিমদের বিরুদ্ধে বদদোয়া বৈধ। তিনি সাধারণভাবে দোয়া করতেন, "হে আল্লাহ, জালিমদের ধ্বংস করো।"


[] খারাপ শব্দ ব্যবহার না করে অপমানের জবাব অপমান দিয়ে করা বৈধ তবে উত্তম নয়:


আল্লাহ বলেন, "আর যদি শাস্তি দিতে চাও, তবে যতোটুকু কষ্ট সে দিয়েছে ততোটুকুই দাও; আর যদি ধৈর্য ধর, তবে নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের জন্য তা উত্তম।"

— (সূরা নাহল ১৬:১২৬)


> রাসূলুল্লাহ (সা.) আমর ইবন হিশামকে 'আবু জেহল' অর্থাৎ 'মূর্খের পিতা' বলেছিলেন, কারণ তিনি ইসলামের প্রতি চরম শত্রুতা ও অজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছিলেন। এখানে উপহাসের উদ্দেশ্য ছিলো না, বরং তার অবস্থান ও আচরণের বাস্তব মূল্যায়ন করা হয়েছিলো। এটা উপহাস বা ব্যঙ্গ অথবা কুটুক্তি ছিলো না, এটা ছিলো ক্রধ প্রকাশ বা অপমান (খারাপ শব্দ বা নিচু শব্দ (যেমন— গরু, গাধা) ব্যবহার না করে।)


> সূরা আল-আ‘রাফ (৭:১৭৯): "আমরা পৃথিবীতে অনেক জ্বীন ও মানুষের মধ্য থেকে এমন লোক সৃষ্টি করেছি, যারা একে ছাড়া অন্যদের জন্য হারাবার মতো নয়; তাদের হৃদয় নেই, তারা চোখ দিয়ে দেখেও কিছু বোঝে না, তারা কান দিয়ে শোনেও কিছু বোঝে না; তারা যেনো চতুষ্পদ প্রাণীর মতো।" = আল্লাহ এখানে গালি বা ব্যঙ্গ বা কুটুক্তি করছেন না। এখানে তিনি ব্যাখ্যা করা হিসেবে অবস্থান ও আচরণের বাস্তব মূল্যায়ন করছেন।


খারাপ শব্দ ব্যবহার করা জায়েজ নয়:


"মুমিন গালি দেয় না, অভিশাপ দেয় না, অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করে না।" (হাদিসটির মূল সূত্র হলো তিরমিযি, আর Riyād aṣ-Ṣāliḥīn বইটিতে এটি আছে Book 17, Hadith 224 হিসেবে।)


> কাউকে অপমান করা হিসেবে "গরু, গাধা, ছাগল" ইত্যাদি বলা জায়েজ নয়।


> ইসলামে বড়োদেরকে "তুই–তুকারি" করে কথা বলা জায়েজ নয়, যদিও সে অপরাধী হয়ে থাকে।


[] "অত্যাচারিত ব্যক্তি যদি প্রতিশোধের জন্য দো'আ করে, তবে তার কোনো দোষ নেই।" (সূরা আশ-শূরা ৪২:৪১)


কিন্তু তার পরেও ইসলাম ক্ষমা ও ধৈর্যের প্রতি বেশি উৎসাহ দেয়। কারণ: আল্লাহ বলেন, "আর যদি তোমরা ক্ষমা করো, তা-ই হবে সবচেয়ে উত্তম।" (সূরা আশ-শূরা ৪২:৪৩)


[] একজন অজ্ঞ, মূর্খ নাস্তিকের পোস্টেও 'Haha' রিঅ্যাক্ট দেয়া আসলে অসৎ অভ্যাস। অনেক ক্ষেত্রে ‘Angry’ রিঅ্যাক্ট দেয়া ঠিক আছে, কিন্তু ‘Haha’ রিঅ্যাক্ট দেয়া অনুচিত।


> রাসূলুল্লাহ (সা.) আমর ইবন হিশামকে 'আবু জেহল' অর্থাৎ 'মূর্খের পিতা' বলেছিলেন, কারণ তিনি ইসলামের প্রতি চরম শত্রুতা ও অজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছিলেন। এখানে উপহাসের উদ্দেশ্য ছিলো না, বরং তার অবস্থান ও আচরণের বাস্তব মূল্যায়ন করা হয়েছিলো। এটা উপহাস বা ব্যঙ্গ অথবা কুটুক্তি ছিলো না, এটা ছিলো ক্রধ প্রকাশ বা অপমান (খারাপ শব্দ বা নিচু শব্দ (যেমন— গরু, গাধা) ব্যবহার না করে।)


> সূরা আল-আ‘রাফ (৭:১৭৯): "আমরা পৃথিবীতে অনেক জ্বীন ও মানুষের মধ্য থেকে এমন লোক সৃষ্টি করেছি, যারা একে ছাড়া অন্যদের জন্য হারাবার মতো নয়; তাদের হৃদয় নেই, তারা চোখ দিয়ে দেখেও কিছু বোঝে না, তারা কান দিয়ে শোনেও কিছু বোঝে না; তারা যেনো চতুষ্পদ প্রাণীর মতো।" = আল্লাহ এখানে গালি বা ব্যঙ্গ বা কুটুক্তি করছেন না। এখানে তিনি ব্যাখ্যা করা হিসেবে অবস্থান ও আচরণের বাস্তব মূল্যায়ন করছেন।


> উহুদ যুদ্ধে কাফির নেতা আবু সুফিয়ান অহংকার করে কথা বলছিলো। সাহাবারা বিদ্রূপে জবাব দিতে চাইলেও নবীজী (সা.) বললেন, "তোমরা এমন কিছু বলো যা তাদের কথার জবাব হয়, কিন্তু মিথ্যা বা ব্যঙ্গ নয়।"


> "তুমি জ্ঞানের সাথে পথের দিকে আহ্বান করো, উপদেশ দাও এবং তাদের সাথে উত্তম পন্থায় বিতর্ক করো।"

— (সূরা নাহল, ১৬:১২৫)


[>] "তারা (কাফিররা) উপহাস করতো, তাই আল্লাহও তাদেরকে উপহাস করেন।”— (সূরা তাওবা, ৯:৭৯)


এখানে 'আল্লাহ উপহাস করেন' কথাটি মানুষের মতো ব্যঙ্গ করার অর্থে নয়, বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে ন্যায়বিচারের রূপক হিসেবে বলা হয়েছে। আল্লাহ কাউকে অন্যায়ভাবে উপহাস করেন না, বরং যারা উপহাস করে, তাদের কর্মের সঠিক ফলাফল দেয়, যেন তারা তাদের ভুল বুঝতে পারে। এখানে, উপহাস করার উদ্দেশ্য এটা যে তারা যেনো বুঝতে পারে যে উপহাস করা ঠিক নয়।


> আমি হাসিনাকে ‘শৈরাচারী’ বা ‘ডাইনি’ বলতে পারি, কিন্তু তার আসল নাম বা চেহারা নিয়ে কি মজা করতে পারি? = না।

___________________________________________________

[] কুটুক্তি ও তিরস্কারের পার্থক্য


তিরস্কার: অন্যায় বা ভুল আচরণ সম্পর্কে সতর্কবার্তা, বা সমালোচনা, যা মূলত শিক্ষামূলক বা শোধনমূলক।


কুটুক্তি: অন্যকে অবমাননা করা, হেয় করা, অশ্লীল বা নিন্দাজনক ভাষা ব্যবহার।


ইসলামে অনেক ক্ষেত্রে তিরস্কার জায়েজ, কিন্তু কুটুক্তি কোনো ক্ষেত্রে জায়েজ নয়।


কোরআন (সূরা হুজুরাত ৪৯:১১) :

"একজন বিশ্বাসী অন্যকে অবমাননা করবেনা, হরান করবেনা, কটু উপাধি দেবে না।"

___________________________________________________

[] কোনো ছোটো বাচ্চা যদি বেশি দুষ্টুমি করে ইসলাম অনুযায়ী কি তাকে মারা যেতে পারে?


= কুরআন থেকে স্নেহ ও দয়ার শিক্ষা:


"আল্লাহর রহমতেই তুমি তাদের প্রতি কোমল হলে। তুমি যদি রূঢ় ও কঠিন হৃদয়ের হতে, তবে তারা তোমার চারপাশ থেকে সরে যেতো।" — (সূরা আলে ইমরান ৩:১৫৯)


শিশুদের প্রতিও আচরণে কোমলতা ও দয়া প্রদর্শনের শিক্ষা এখান থেকে প্রমাণিত।


হাদিস থেকে, রাসূল ﷺ শিশুদের প্রতি দয়া করতেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "যে ছোটোদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়োদের সম্মান করে না, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।" — (সুনান আত-তিরমিজি ১৯২০, সহিহ)


নামাজ শেখানোর শিক্ষা রাসূল ﷺ বলেছেন, "তোমরা তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়স হলে নামাজ পড়ার নির্দেশ দাও, আর দশ বছর বয়স হলে (না পড়লে) হালকা শাসন করো, এবং তাদের শয্যা আলাদা করো।" — (আবু দাউদ ৪৯৫, সহিহ)


এখানে ১০ বছর বয়স পর্যন্তও মারধরের কথা বলেননি। শুধু ১০ বছর হলে নামাজে গাফিল হলে হালকা শাসন করার অনুমতি দিয়েছেন—এটিও "আঘাতমূলক মার" নয়, বরং শাসনমূলক ও শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে।


শিশুদের মারধরের নিন্দা এক সাহাবী বললেন: আমি কখনো রাসূল ﷺ–কে কোনো স্ত্রী, কোনো দাস কিংবা কোনো বাচ্চাকে মারতে দেখিনি। — (সহিহ মুসলিম ২৩২৮)

____________________________________________________

[] স্ত্রীকে কি মারা যেতে পারে? (না)


রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমরা তোমাদের স্ত্রীর প্রতি সদাচরণ করো, কারণ তারা তোমাদের অধীনস্ত।" 

(সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৩৫৪৮)


[] ভিন্ন এক প্রেক্ষাপট:


(সূরা নিসা ৪:৩৪)


"পুরুষদের স্ত্রীদের ওপর কর্তৃত্ব আছে, কারণ আল্লাহ একজনকে অন্যের চেয়ে কিছু দিয়ে উত্তম করেছেন, এবং তারা তাদের ধন-সম্পদ থেকে ব্যয় করে। যারা কলহ বা অবাধ্যতা করে, প্রথমে তাদের সান্ত্বনা দাও, তারপর শয্যায় আলাদা হও, এবং যদি তা না হয়, তবে (সীমিত ইঙ্গিত) মারো। তবে অত্যন্ত সাবধান হও—এটি তাদের আঘাত দেয়ার জন্য নয়।”


> মারার ধাপ এবং শর্ত


আয়াতে "মারা" বলা হয়েছে, কিন্তু ইসলামী তাফসির এবং হাদিস বিশ্লেষকরা তিনটি ধাপ দেখান:


(১) সান্ত্বনা/উপদেশ দেয়া।


স্ত্রীর আচরণে সমস্যা থাকলে প্রথমে কথা বলা, বোঝানো বা পরামর্শ দেয়া।


(২) শয্যায় আলাদা থাকা।


যদি কথার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান না হয়, তবে শারীরিকভাবে আলাদা থাকা (বিছানায় না থাকা)।


(৩) সীমিত ইঙ্গিত বা প্রতীকী পদক্ষেপ :


শারীরিক আঘাত নয়। শুধুমাত্র চূড়ান্ত এবং প্রতীকী পদক্ষেপ, যেমন খুব হালকা ধাক্কা বা নির্দেশক ইঙ্গিত।


ইসলামী বিশ্লেষকরা বলেন, "এটি মারার অনুমতি নয়, বরং প্রতীকী সতর্কবার্তা।"


কোনো কনক্রিট বা ক্ষতি করা, আহত করা বা অপমান করা এ ক্ষেত্রে হারাম।

____________________________________________________


Comments

Popular posts from this blog

অলৌকিক ঘটনা কি কেবল নবি রসূলদের সাথেই ঘটে?

ইসলামে চুরির শাস্তি

দার্শনিক নানা বিষয় একত্রে :