আমি কুরআন-হাদিসের সরাসরি অনুবাদ নয় — সূক্ষ্ম ব্যাখ্যার দ্বারা জান্নাত-জাহান্নামের শাস্তির ব্যাপারে যতোটুকু বুঝতে পারলাম তা হলো
আমি কুরআন-হাদিসের সরাসরি অনুবাদ নয় — সূক্ষ্ম ব্যাখ্যার দ্বারা জান্নাত-জাহান্নামের শাস্তির ব্যাপারে যতোটুকু বুঝতে পারলাম তা হলো— কেউ একজন কেবল অমুসলিম পরিচয়ের জন্য বা বলতে পারি সে যে সমাজে অমুসলিম নামে পরিচিত কেবল তার এ পরিচয়ের জন্য জাহান্নামে যাবে, ব্যাপারটা এমন নয় (সে তার কর্মের জন্য জাহান্নামে যাবে)। আবার কেউ একজন কেবল তার নবি পরিচয়ের জন্য বা সমাজে যে তিনি নবি নামে পরিচিত কেবল এই পরিচয়ের জন্য জান্নাতের উচু স্থান পাবেন, এমনও নয় (তিনি তার কর্মের জন্য জান্নাতের উচু স্থান পাবেন)। আল্লাহ একজন মানুষের জীবনের পরিস্থিতি, সুযোগ, বোঝাপড়া, অনিচ্ছাকৃতভাবে করা, বুঝে করা— এসব কিছু মিলিয়ে তার বিচার করবেন, এবং সে বিচার অনুযায়ী তাকে জান্নাতের উচ্চ স্থান, নিম্ন স্থান, অথবা জাহান্নামের উচ্চ স্থান, নিম্ন স্থান-কাউকে বেশি, কাউকে কম দেবেন। আল্লাহ মিযান দিয়ে পাপ-পুণ্যের হিসাব করবেন— তার মানে ব্যাপারটা এমন নয় যে আল্লাহ মেপে দেখার ক্ষেত্রে মিযানের ওপর নির্ভরশীল।
স্রষ্টা যে এক— এটা একটি স্বাভাবিক প্রবৃত্তি বা বিশ্বাস, সবাই এই বিশ্বাস নিয়ে জন্ম নেয়। কেউ যখন সমাজের ভুল বিশ্বাস দ্বারা প্রভাবিত হয়ে, বা না বুঝে এই প্রবৃত্তি বা বিশ্বাস থেকে দূরে চলে যায়— তখন আল্লাহ ন্যায়বিচার করবেন। কিন্তু সে ন্যায়বিচারের খুঁটিনাটি সবকিছু আল্লাহ বলেননি। মানুষ সত্যকে জানার নানা সুযোগ পায়। একজন ডাক্তার রোগীর শরীরের জটিল প্রক্রিয়া দেখবেন, শরীরের নানা জটিল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ইত্যাদি দেখে তিনি বুঝবেন একজন স্রষ্টা আছেন। একজন বিজ্ঞানী চাঁদ, গ্রহ-তারা ইত্যাদি দেখে বুঝবেন একজন স্রষ্টা আছেন। একজন পুরুষ অথবা নারী তার শরীরের গঠন, অথবা তার সন্তান-সন্ততি দেখে বুঝবেন একজন স্রষ্টা আছেন।
কেউ যদি অবজ্ঞার সাথে অথবা অহংকারবশত এই সত্যকে অস্বীকার করে এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তওবা না করে— আল্লাহ তওবা করার নানা সুযোগ দেবেন তবুও করবে না— তাহলে তাকে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। আবার যাদের কাছে আল্লাহ নবি-রাসূল পাঠাননি, কিংবা যারা সত্যকে ভুলভাবে জেনেছে— তাদের সাথেও আল্লাহ ন্যায়বিচার করবেন। কিন্তু সে ন্যায়বিচার কেমন হবে, তার খুঁটিনাটি আল্লাহ বলেননি।
কোনো ছোটো বাচ্চা যদি মারা যায়, তাহলে সে জান্নাতে যাবে। কিন্তু মুহাম্মদ ﷺ জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থান পাবেন। ছোটো বাচ্চারা সর্বোচ্চ স্থান পাবে না। এর মানে এই নয় যে ছোটো বাচ্চারা কষ্টে থাকবে— বরং তারা কম পাবে। আর মুহাম্মদ ﷺ নবি পরিচয় পেয়েছেন বা কেবলমাত্র তার এ পরিচয়ের জন্য সর্বোচ্চ স্থান পাবেন— এমন নয়, তাঁর জীবনে নানা পরীক্ষা ছিলো, তিনি সেগুলোতে সফল হয়েছেন, এ কারণে তিনি সর্বোচ্চ স্থান পাবেন। ভালো থাকা, আর বেশি সুখে থাকা দুটো এক নয়, আমি ভালো আছি মানে আমি কষ্টে নেই; সুখেই আছি। আর আমি বেশি সুখে আছি মানে আমি অনন্দের ভেতর আছি।
এখন প্রশ্ন: কেউ যদি বড়ো হয়, তখন তো তার জাহান্নামে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে; অপরদিকে ছোটো বাচ্চারা মারা গেলে জান্নাতে যাবে। এটা কি অন্যায়? না, অন্যায় নয়। কারণ কেউ যখন জেনে-বুঝে সত্যকে অস্বীকার করবে, বারবার, আর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত — তওবা করার নানা সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও তওবা করবে না— তখন তারা তো জাহান্নামে থাকারই উপযুক্ত। এক্ষেত্রে সে বলতে পারবে না— ছোটো বাচ্চারা মারা গেলে জান্নাতে গেলো, আর আমি কেন জান্নাতে যেতে পারবো না!
জাহান্নামের শাস্তির সীমা: কুরআনে আল্লাহ সূরা তাওবা বাদে প্রতিটি সূরার শুরুতে বলেছেন— আল্লাহ পরম করুণাময় ও অতি দয়ালু। কিন্তু এর মানে কি আল্লাহ মানুষকে কষ্ট দেবেন না? আবার আল্লাহ বলেছেন কুরআনকে তিনি সহজ ভাষায় নাজিল করেছেন, তার মানে কি "প্রত্যেকেই" সহজে বুঝবে? বা ধরুন যার কোনো মানসিক সমস্যা আছে সেও কি সহজে বুঝবে? জান্নাত-জাহান্নামের শাস্তি ও পুরস্কারের ব্যাপারে কুরআনের সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা দ্বারা যতোটুকু বোঝা যায় তা হলো: জাহান্নামের যে আকাশ ও জমিন— সেটা যতোক্ষণ পর্যন্ত স্থায়ী থাকবে, ততোক্ষণ পর্যন্ত জাহান্নামিদের "অনেকে" শাস্তি ভোগ করবে। আবার জান্নাতের ক্ষেত্রে— জান্নাতের আকাশ ও জমিন যতোক্ষণ পর্যন্ত স্থায়ী থাকবে, ততোক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতবাসীরা পুরস্কার ভোগ করবে, যে যার স্থান ও পরিমাণ অনুযায়ী।
এখন প্রশ্ন হলো: আল্লাহ নিজে কেন এসব কিছু কুরআনে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেননি? তার একটি কারণ হলো যেনো মানুষ ইজতিহাদ করতে পারে; চিন্তা-গবেষণা করতে পারে— যে যার জায়গা থেকে যতোটুকু সম্ভব। আল্লাহ সবাইকে তার অবস্থা, পরিস্থিতি, সুযোগ— এসব বিবেচনা করে সেই অনুযায়ী বিচার করবেন।
আমরা তো সব বুঝি না— একটা বুঝলে অন্যটা বুঝি না। সব দেখি না— সামনে তাকালে পেছনে দেখতে পারি না। কিন্তু আল্লাহ সবই বোঝেন, সবই দেখেন, সবই জানেন।
Comments
Post a Comment