গানবাজনা ও ইসলাম :
গানবাজনা ও ইসলাম :
আনাস বিন মালিক (রা) বলেন নবী (সা.) যুদ্ধ অথবা সফর শেষে (মদিনায়) ফিরে এসেছিলেন, তখন মদীনার কিছু কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি তাঁকে স্বাগত জানালো। তারা তাঁর সামনে নাচছিলো এবং তাদের (হাবশার) ভাষায় গান গাইছিলো এবং বলছিলো মুহাম্মাদ এসেছেন, তিনি একজন সৎকাপিরায়ণ ব্যক্তি। কিন্তু নবী (সা.) (তাদের কথা গুলো) বুঝতে পারলেন না। তাই তিনি লোকদের জিজ্ঞাসা করলেন তারা কি বলছে? লোকেরা বললো, তারা বলছে 'মুহাম্মাদ আল্লাহর সৎকর্মপরায়ণ বান্দা'।
– (সুনান আল কুবরা, ৪২৩৬) হাদিসের মান: সহীহ।
> গানে যদি হারাম কিছু না থাকে তাহলে তা গাওয়া জায়েজ।
> নারীরা পুরুষের সামনে নয়, কেবল পুরুষ যদি শুধু নাচের মতো করে গা নড়ায় তাহলে তা জয়েজ।
নাফে (রহ.) বলেন, "আমি আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা.)-এর সঙ্গে এক সফরে ছিলাম। তিনি পথে এক রাখালের বাঁশি বাজানোর শব্দ শুনতে পেলেন। তখন তিনি তাঁর দুই কানে আঙুল ঢুকিয়ে দিলেন এবং তাঁর বাহনটিকে রাস্তা থেকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিলেন। এরপর তিনি আমাকে বলতে লাগলেন,
'হে নাফে, তুমি কি এখনও সেই শব্দ শুনতে পাচ্ছ?' আমি বললাম, 'হ্যাঁ।' তখন তিনি চলতেই থাকলেন। কিছুক্ষণ পর আবার জিজ্ঞাসা করলেন, 'তুমি কি এখনও শুনতে পাচ্ছ?'
আমি বললাম, 'হ্যাঁ।' অবশেষে যখন শব্দ বন্ধ হয়ে গেল, আমি বললাম, 'এখন আর শোনা যাচ্ছে না।' তখন তিনি তাঁর কান থেকে আঙুল সরিয়ে নিলেন এবং তাঁর বাহনটিকে আবার আগের পথে ফিরিয়ে নিলেন। এরপর তিনি বললেন,
'আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে একবার এমনই এক রাখালের বাঁশি বাজানোর শব্দ শুনতে পেলে ঠিক এভাবেই করতে দেখেছি।'"
— (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৪৫৩৫)
<?> যদি বাশির শব্দ হারামই হতো তাহলে রাসূল (সা.) আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রা.)-কেও কি বাশির আওয়াজ শুনতে মানা করতেন না? তিনি কি বলতেন, "তুমি কি এখনো শুনতে পাচ্ছো?"? কারণ রাসূল (সা.)-এর বেলাতেও ঘটনাটা এমনই ছিলো। তাহলে রাসূল (সা.) কেন কানে হাত দিয়েছিলেন? কারণ তিনি ইবাদত করছিলেন।
"হালাল" গান হওয়া কি কেবল বিশেষ অনুষ্ঠানে হালাল?
আনাস ইবন মালিক (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) এক সফরে ছিলেন। তাঁর একজন খাদেম বা উটচালক ছিলো, যার নাম ছিলো আঞ্জাশা। সে সুন্দর কণ্ঠে উট চলার গান গাইতো। তখন নবী (সা.) তাকে বললেন, "হে আঞ্জাশা! আস্তে চালাও। কাঁচের পাত্রগুলো ভেঙে ফেলো না।" (অর্থাৎ নারীদের ব্যাপারে সাবধান হও; তারা কোমল কাঁচের পাত্রের মতো।)
— (সহীহ বুখারী, কিতাবুল আদব )كتاب الأدب( হাদীস নং: ৬১৪৯ (ফাতহুল বারী/দারুসসালাম নম্বরিং অনুযায়ী, সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফাদাইল )کتاب الفضائل( হাদীস নং: ২৩২৩ (দারুসসালাম নম্বরিং অনুযায়ী)
এ হাদিস থেকে প্রমাণ হয় "হালাল" গান হওয়া কেবল বিশেষ অনুষ্ঠানে হালাল নয়, বিশেষ অনুষ্ঠান ছাড়াও হালাল।
আর বিশেষ অনুষ্ঠানের অনেক হাদিস আছে, যেমন নিচের হাদিস:
এক বিয়েতে নবী (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, "তোমরা কি কনেকে পাঠিয়েছো? ... তার সাথে কি কাউকে পাঠিয়েছো যে গান গাইবে?" কারণ আনসাররা গান পছন্দ করতো। – (সহিহ বুখারি (৫১৬২-এর আশেপাশে, কিতাবুন নিকাহ)
এতে বোঝা যায়-বিয়েতে গান প্রচলিত ছিলো এবং নবী (সা.) তা নাকচ করেননি। কিন্তু এগুলো হারাম গান ছিলো না, এবং যুবতীরা গাইতো না, কিশোরীরা গাইতো।
আয়িশা (রা.) বলেন, ঈদের দিনে আমার কাছে আনসারদের দুই কিশোরী ছিলো; তারা গান করছিলো এবং দফ বাজাচ্ছিলো। তখন আবু বকর (রা.) বললেন, "রাসূলুল্লাহ-এর ঘরে শয়তানের বাঁশি!" নবী (সা.) বললেন, ওদের ছেড়ে দাও, হে আবু বকর। প্রত্যেক জাতির একটি ঈদ আছে; আর এটি আমাদের ঈদ।
– (সহীহ বুখারি, হাদিস নং ৯৫২, সহীহ মুসলিম হাদিস নং ৮৯২)
মুহাম্মাদ ইবনু হাতিব আল-জুমাহি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, হালাল বিবাহ ও হারাম বিবাহের পার্থক্য হলো— বিবাহে দফ বাজানো ও প্রকাশ্য ঘোষণা (প্রকাশ্য ঘোষণা = উচ্চস্বরে বিবাহের কথা বলা, বিয়ের অনুষ্ঠানে আনন্দ প্রকাশ, কিশোরীদের হালাল গান।)
– (সুনান আত-তিরমিজি, হাদিস নং ১০৮৮)
> তবে, এখানে হারাম গানবাদ্য বোঝানো হয়নি।
> প্রাপ্তবয়স্ক বা যুবতী নয়, কিশোরী বা অল্পবয়সী মেয়ে পুরুষের সামনে হালাল গান গাওয়া জায়েজ।
> আর প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের ক্ষেত্রে একা অথবা মাহরামের সামনে "হালাল" গান গাওয়া জায়েজ।
বিশেষ অনুষ্ঠান ছাড়াও দফ বাজানো কি জায়েজ?
সহীহ হাদিসে ঈদ, বিবাহ ও বিশেষ অনুষ্ঠানে দফ বাজানোর অনুমতি এসেছে। এছাডা দফ বাজানো নাজায়েজ এমন কোনো হাদিস নেই এবং জায়েজ এমন কোনো হাদিসও নেই।
হারাম কাজের জন্য মানত করা যায় না। তাহলে রাসূল (সা.) কেন দাসীকে বললেন না যে, গান গাওয়ার জন্য মানত করলে তা করা যাবে না? :
হযরত বুরাইদা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, একবার নবী (সা.) যখন যুদ্ধ থেকে বিজয়ী হয়ে মদিনায় ফিরে আসলেন, তখন একজন কৃষ্ণাঙ্গ দাসী নবী (সা.)-এর কাছে এসে বললো, হে আল্লাহর রাসূল, আমি মানত করেছিলাম যে, যদি আল্লাহ আপনাকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনেন, তাহলে আমি আপনার সামনে দাফ বাজাবো এবং আপনার জন্য একটি গান গাইবো। নবী (সা.) বললেন, যদি তুমি মানত করে থাকো, তাহলে তোমার মানত পূরণ করো, আর যদি মানত না করে থাকো, তাহলে তা কোরো না। এরপর সেই কৃষ্ণাঙ্গ দাসী বললো, "হ্যাঁ, আমি সত্যিই মানত করেছিলাম। তখন নবী (সা.) বসলেন এবং সে দাফ বাজাতে শুরু করলো। ইতিমধ্যে আবু বাকার (রা.) এবং তার সঙ্গে আরও কয়েকজন সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এরপর উমর (রা.) আসলেন। বুরাইদা (রা.) বলেন, দাসীটি একটি চাদর পরিধান করেছিলো। যখন সে উমর (রা.)-কে দেখতে পেলো, তখন দাফটি তার পেছনে লুকিয়ে রাখলো। এটা দেখে নবী (সা.) বললেন, "উমর, শয়তান কেবল তোমাকেই ভয় পায়।"
— (মুসনাদে আহমদ, ২৩০১১) হাদিসের মান: সহিহ।
[] এখানে হারাম গান গাওয়া হচ্ছিলো না। হালাল গান গাওয়া হচ্ছিল।
[] অনেক আলেম বলেন দাসীটি কিশোরী ছিলো, যুবতী নয়।
<?> রাসূল (সা.) কেন বললেন যে, মানত না করে থাকলে কোরো না? কারণ রাসূল (সা.) চাচ্ছিলেন না যে, বিজয় উদযাপনের জন্য গান গাওয়া হোক; বরং তিনি ইবাদত-বন্দেগি করতে চাচ্ছিলেন।
<?> রাসূল (সা.) কেন বললেন, 'উমর, শয়তান কেবল তোমাকেই ভয় পায়'? কারণ অন্য হাদিসেও দফ বাজানো হালাল হলেও উমর (রা.) তা জানতেন না এবং বাদ্যযন্ত্রের বিরুদ্ধে উমর (রা.) কথা বলেছিলেন। এ কারণে রাসূল (সা.) উমর (রা.)-এর চরিত্রের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন যে, শয়তান কেবল তোমাকেই ভয় পায় আর নারীটি ভৎসনার শিকার হবে ভেবে দফটি লুকিয়ে রেফেছিলো। কিন্তু সব গান-বাজনা হারাম নয়। যদি সব গান-বাজনাই হারাম হতো, তাহলে রাসূল (সা.) বলতেন, 'না, হারাম জিনিস নিয়ে মানত করা যাবে না।
নবী ﷺ বলেছেন, “আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু লোক অবশ্যই আসবে, যারা যিনা (অবৈধ যৌনতা), রেশম, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল (বৈধ) মনে করবে।”
— (সহিহ আল-বুখারি, কিতাবুল আশরিবা
হাদিস নম্বর: ৫৫৯০ (অনেক সংস্করণে ৫৫৯০/৫৫৯১ হিসেবে আসে)
> এখানে রেশমের কাপড়ের কথা বলা হয়েছে, রেশমের কাপড় কি নারীদের জন্য হারাম? না। ঠিক তেমনি, এ হাদিস দ্বারা সব ধরনের বাদ্যকে হারাম বোঝানো হয়নি।
Comments
Post a Comment