আমেরিকা-ইসরায়েল, শিয়া, সুন্নি:

 আমেরিকা-ইসরায়েল, শিয়া, সুন্নি:

> পৃথিবীতে এখন বিভিন্ন দেশে যে সংঘাতগুলো চলছে যেমন— রাষ্ট্রীয় সংঘাত, ধর্মীয় সংঘাত, আকিদাগত সংঘাত (শিয়া-সুন্নি) এগুলোর ধর্মীয় সংঘাত ও আকিদাগত সংঘাতের বেশিরভাগও হচ্ছে মূলত রাষ্ট্রীয় স্বার্থে:

[] বাংলাদেশ একটি সুন্নি মুসলিম প্রধান দেশ এবং পাকিস্তানও একটি সুন্নি মুসলিম প্রধান দেশ, আর পাকিস্তানকে সাধারণত আমাদের চেয়ে বেশি ধার্মিক ধরা হয়। সেই পাকিস্তান ১৯৪৭-১৯৭১ পর্যন্ত আমাদের অত্যাচার করেছে। আফগানিস্তান সুন্নি মুসলিম প্রধান দেশ এবং পাকিস্তানও, তবুও তাদের ভেতর সংঘাত। ইসরায়েলের ১৮ শতাংশ মানুষ মুসলিম, কিন্তু ইসরায়েল তাদের ওপর গণহত্যা চালাচ্ছে না। অনেক ইসরায়েলি মুসলিম অনেক সময় বৈষম্যের শিকার হয়, কিন্তু তারা সাধারণত ভালোই আছে এবং অনেকেই সংসদে অংশ নেয়। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েল গণহত্যা চালাচ্ছে, কারণ এক্ষেত্রে তাদের রাষ্ট্রীয় স্বার্থ আছে। তারা তাদের ভূখণ্ড সম্প্রসারণ করতে চায়, পশ্চিম তীরের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে চায়।

সুন্নি দ্বারা শিয়া হত্যা: ১৯৭৯-২০০৩ ইরাকের সাবেক শাসক সাদ্দাম হোসেনের আমলে শিয়াদের ওপর চরম নির্যাতন চালানো হয়। ১৯৯১ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রায় ১,০০,০০০ থেকে ২,০০,০০০ শিয়াকে হত্যা করা হয়েছিলো বলে ধারণা করা হয়। ভিন্ন আকিদার জন্য হত্যা করা হয়েছে, কিন্তু করা হয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বার্থে।

সুন্নি দ্বারা শিয়া হত্যা: ২০১৪ সালের জুন মাসে ইরাকের তিকরিত শহরের কাছে অবস্থিত 'ক্যাম্প স্পাইকার' নামক একটি বিমান ঘাঁটিতে একটি নৃশংস ঘটনাটি ঘটে। তৎকালীন জঙ্গি গোষ্ঠী আইএসআইএস (ISIS) এই ঘাঁটিটি দখল করার পর সেখান থেকে প্রায় ১,৭০০ শিয়া সেনাকে আলাদা করে নিয়ে গিয়ে গুলি করে ও নদীতে ফেলে হত্যা করেছিলো।

সুন্নি দ্বারা শিয়া হত্যা: পাকিস্তান ও আফগানিস্তান, এই দুই দেশে চরমপন্থী সুন্নি গোষ্ঠীগুলো (যেমন লস্কর-ই-জাংভি বা আইএস-কে) নিয়মিত শিয়াদের ওপর হামলা চালিয়ে আসছে। বিশেষ করে হাজারা শিয়া জনগোষ্ঠী প্রায়শই এই হামলার শিকার হয়। এগুলো আকিদাগত স্বার্থে নয়, বরং মূলত রাষ্ট্রীয় স্বার্থে হয়েছে। কিন্তু আকিদা এখানে একটি কারণ।

শিয়া দ্বারা সুন্নি হত্যা: ইরান তাদের নিজ দেশে অনেক সময় সুন্নি হত্যা করেছে। এছাড়া, ২০১১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে অন্তত ৫,০০,০০০ থেকে ৬,০০,০০০ মানুষ নিহত হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ২,৩০,০০০ জনই ছিলো সাধারণ বেসামরিক নাগরিক, যাদের সিংহভাগ (প্রায় ৮০-৯০%) সুন্নি মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত। বাশার আল-আসাদকে টিকিয়ে রাখতে ইরান এবং তাদের সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়া বাহিনী সুন্নি অধ্যুষিত শহরগুলোতে (যেমন: আলেপ্পো, ইদলিব, হোমস) ভারী অস্ত্র ও বিমান হামলা চালিয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়। ইরান সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীগুলো তাদের নিজ অঞ্চলে (ইয়েমেন) দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে লিপ্ত এবং এর ফলে বিপুল সংখ্যক সুন্নি মুসলিম প্রাণ হারিয়েছেন। ২০১৪ সাল থেকে ইয়েমেনে হুথিদের সাথে সুন্নি নেতৃত্বাধীন সরকারের যুদ্ধে অন্তত ৩,৭৭,০০০ মানুষ মারা গেছেন (২০২২ সালের শুরুর দিকের হিসাব অনুযায়ী)। এর মধ্যে ১,৫০,০০০-এর বেশি মানুষ সরাসরি যুদ্ধের কারণে মারা গেছেন এবং বাকিরা অনাহার ও রোগের কারণে। ইয়েমেনের জনসংখ্যার অধিকাংশ সুন্নি হওয়ায়, হুথিদের অবরোধ (যেমন তাইজ শহর), গোলাবর্ষণ এবং স্থলমাইন বিস্ফোরণে হাজার হাজার সুন্নি সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।

[] ইরান শিয়া হলেও, ফিলিস্তিনের হামাস যারা সুন্নি তাদেরকে সহযোগিতা করে। এটা তারা মূলত রাষ্ট্রীয় স্বার্থে করে, কারণ ইসরায়েল হামাসেরও শত্রু।

[] শিয়াদের মধ্যে মোট ২০-২৫টি উপদল পাওয়া যায়। তারা সবাই কুরআনকে মানুষের লেখা মনে করে না এবং সবাই আলি (রা.) ছাড়া বাকি সব সাহাবিদেরকে কাফের মনে করে না, এবং সবাই আয়েশা (রা.) সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করে না। শিয়াদের ভেতর জায়েদি শিয়ারা মনে করে ফিলিস্তিনিদের রক্ষা করা তাদের ঈমানি দায়িত্ব। ইসনা আশারিয়া শিয়াদের ভেতরেও অনেকে বিশ্বাস করে ফিলিস্তিনিদের রক্ষা করা তাদের ঈমানি দায়িত্ব। কিন্তু তারা যে হামাসকে সহযোগিতা করে এর মূল কারণ হলো হামাস ইসরায়েলের শত্রু। 

[] শিয়ারা শিয়া হলেও তারা ইসলামের অনেক বিধানকে অনেক গুরুত্ব দেয়। যেমন: সৌদি আরবে বাদশাহ বংশানুক্রমে নিযুক্ত হন, যা ইসলামের নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ইসলামের মতে, একজন ঈমানদার এবং যোগ্য ব্যক্তি বাদশাহ হওয়া উচিত। এবং আর তা যেহেতু সৌদি আরবে হয় না তাই ইরান এর সমালোচনা করে। ইরানে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর নারীদের জন্য হিজাব বা পর্দা করা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ইরানে নারীদের পর্দা বা হিজাব না পরার জন্য জেল এবং জরিমানার বিধান রয়েছে। ইরানি শিয়াদের (বারো ইমামি) বিশ্বাস অনুযায়ী দেশ পরিচালনার মূল অধিকার একমাত্র ইমামদের। ইরানের শিয়া ধর্মাবলম্বীরা প্রতি বছর পবিত্র রমজান মাসের শেষ শুক্রবারকে 'আল-কুদস দিবস' হিসেবে পালন করে; ফিলিস্তিনিদের ওপর চলা নির্যাতনের প্রতিবাদে এবং জেরুজালেম বা আল-কুদস শহরকে ইসরায়েলি দখলদারিত্ব থেকে মুক্তির দাবিতে এই দিনটি পালিত হয়। 

[] সৌদি আরবের অনেক ভালো ভালো ইসলামী কাজ আছে। যেমন— কিং সালমান হিউম্যানিটারিয়ান এইড: এটি বিশ্বের অন্যতম বড়ো মানবিক সহায়তা সংস্থা। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব মানবিক সহায়তায় বিশ্বে দ্বিতীয় এবং আরব বিশ্বে প্রথম স্থান অধিকার করেছে। তারা ইয়েমেন, সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও নাইজেরিয়াসহ বিশ্বের ৪৪টিরও বেশি দেশে খাদ্য, স্বাস্থ্য ও বাসস্থান সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছে।

শিক্ষাবৃত্তি ও আলেম তৈরি: মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে সারা বিশ্বের মুসলিম ছাত্রদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পড়াশোনার সুযোগ দেয়। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষেও তারা আন্তর্জাতিক ছাত্রদের জন্য টিউশন ফি মওকুফ, আবাসন এবং মাসিক বৃত্তির ব্যবস্থা রেখেছে।

কুরআন বিতরণ ও প্রকাশনা: মদিনার কিং ফাহদ কমপ্লেক্স থেকে প্রতি বছর কয়েক কোটি কুরআন শরীফ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করে বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়। এছাড়াও তারা ২০২৬ সালের উপহার হিসেবে বিভিন্ন দেশে ১৭,০০০ টনের বেশি উন্নতমানের খেজুর পাঠাচ্ছে।

[] কিন্তু সৌদি আরবে বাদশাহ বংশানুক্রমে নিযুক্ত হন, যা ইসলামের নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ইসলামের মতে, একজন ঈমানদার এবং যোগ্য ব্যক্তি বাদশাহ হওয়া উচিত, এবং সৌদি আরবে নারীদের জন্য আবায়া (বোরকা) পরার বাধ্যবাধকতা শিথিল করা হয়েছে এবং অনেক জায়গায় পর্দার বিধান ছাড়াই চলাফেরার অনুমতি দেয়া হয়েছে। এছাড়া সিনেমা হল চালু করা এবং সৈকতগুলোতে পশ্চিমা ধাঁচের বিনোদনের অনুমতি দেয়া হয়েছে। সৌদি জেনারেল এন্টারটেইনমেন্ট অথরিটি বর্তমানে রিয়াদ সিজন বা জেদ্দা সিজনের মতো বড়ো বড়ো উৎসব আয়োজন করছে। যেখানে পশ্চিমা সঙ্গীতশিল্পীদের কনসার্ট, নাচ-গান এবং নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার সুযোগ থাকে, যা দেশটির আগের ধর্মীয় রীতির পরিপন্থী।

ইরাক-ইরান যুদ্ধে সাদ্দাম হোসেন ইরানের তেলসমৃদ্ধ প্রদেশ খুজস্তান দখলের মাধ্যমে ইরাকের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী এবং ইরানকে সামরিকভাবে দুর্বল করতে চেয়েছিলো। সাদ্দাম হোসেন দুই দেশের (ইরাক ও ইরান) মধ্যবর্তী জলপথ 'শাত আল-আরব'-এর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়ার আকাঙ্ক্ষা ছিলো যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ। ১৯৭৫ সালের আলজিয়ার্স চুক্তিতে এই জলপথের কর্তৃত্ব ভাগাভাগি হলেও, ইরাক পরবর্তীতে এর ওপর একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলো। আর, সৌদি আরব ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় সরাসরি ইরাককে ব্যাপক সহযোগিতা করেছিলো। যদিও শুরুতে সৌদি আরব নিরপেক্ষতা ঘোষণা করেছিলো, কিন্তু ইরানি বিপ্লবের আদর্শ ছড়িয়ে পড়ার ভয়ে তারা সাদ্দাম হোসেনের পক্ষ নেয়।

ভালো দিক: ১৯৭০-এর দশকের শুরু থেকেই সৌদি আরব পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে বড়ল অংকের অর্থায়ন করেছে বলে জানা যায়। ১৯৮০-র দশকে একজন সাবেক সিআইএ কর্মকর্তার মতে, সৌদি আরব পাকিস্তানের এই প্রকল্পে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তা দিয়েছিলো।

[[]] ইরান কেন সৌদি আরবের শত্রু?

সৌদি আরব ও ইরানের বর্তমান চরম শত্রুতার মূলে রয়েছে ঐতিহাসিক কিছু ঘটনা ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। যদিও ১৯৭৯ সালের আগে দেশ দুটির মধ্যে মোটামোটি সুসম্পর্ক ছিলো, কিন্তু কয়েকটি প্রধান কারণে তারা একে অপরের শত্রু হয়ে ওঠে:

ইরানে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লব: এটি ছিলো সম্পর্কের মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার প্রধান ঘটনা। এই বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানে রাজতন্ত্রের পতন ঘটে এবং আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে একটি ধর্মীয় সরকার গঠিত হয়। খোমেনি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের রাজতন্ত্রের, বিশেষ করে সৌদি আরবের, কড়া সমালোচনা শুরু করেন এবং ইরানের এই বিপ্লবী মডেলকে অন্য দেশগুলোতে ছড়িয়ে দেয়ার ঘোষণা দেন। এতে সৌদি রাজপরিবার নিজেদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি বোধ করতে শুরু করে।

> কড়া সমালোচনাগুলো কী ছিলো:

১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর আয়াতুল্লাহ খোমেনির সৌদি আরবের প্রতি কড়া সমালোচনা মূলত তাদের শাসনব্যবস্থার বৈধতা এবং পবিত্র স্থানসমূহের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে ছিলো। তার সমালোচনার প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

রাজতন্ত্রের বিরোধিতা: খোমেনি ঘোষণা করেন যে ইসলাম এবং রাজতন্ত্র (বংশানুক্রমিক শাসন) পরস্পরবিরোধী। তিনি রাজতন্ত্রকে একটি "তাগুত" ব্যবস্থা হিসেবে অভিহিত করেন।

পবিত্র কাবার হেফাজতকারী হিসেবে অযোগ্যতা: তিনি সৌদি রাজপরিবারকে মক্কা ও মদিনার পবিত্র স্থানসমূহের রক্ষণাবেক্ষণকারী হিসেবে অযোগ্য মনে করতেন। তার মতে, এই পবিত্র স্থানগুলো কোনো নির্দিষ্ট রাজপরিবারের নয়, বরং পুরো মুসলিম উম্মাহর অধীনে থাকা উচিত।

পশ্চিমা শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা: খোমেনি সৌদি শাসকদের "আমেরিকার অনুচর" বা "বড়ো শয়তানের স্বার্থরক্ষাকারী" হিসেবে অভিযুক্ত করেন। তিনি মনে করতেন তারা পশ্চিমা স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে ইসলামের অবমাননা করছে।

ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রচার: তিনি সৌদি আরবের ওয়াহাবি মতাদর্শকে ইসলামের একটি বিকৃত রূপ হিসেবে দেখতেন এবং একে "আমেরিকান ইসলাম" বলে অভিহিত করতেন।

বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ: ১৯৮৭ সালের মক্কা দুর্ঘটনার পর তিনি সৌদি রাজপরিবারকে "আল্লাহর ঘরের শত্রু" এবং "মুসলিমদের পিঠে ছুরিকাঘাতকারী" হিসেবে বর্ণনা করেন। এই সমালোচনাগুলো সৌদি রাজপরিবারের জন্য চরম অস্তিত্ব সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো, কারণ খোমেনি সরাসরি তাদের শাসনের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ভিত্তিকেই চ্যালেঞ্জ করেছিলেন।

আঞ্চলিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা: সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে মুসলিম বিশ্বের নেতা এবং পবিত্র মক্কা ও মদিনার রক্ষক হিসেবে মনে করে আসছে। কিন্তু ইসলামী বিপ্লবের পর ইরান নিজেকে মুসলিম উম্মাহর প্রকৃত রক্ষক হিসেবে দাবি করতে শুরু করে। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে নেতৃত্ব ও প্রভাব বিস্তার নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হয়।

ইরান–ইরাক যুদ্ধ (১৯৮০–৮৮): ইরাক-ইরান যুদ্ধে সাদ্দাম হোসেন ইরানের তেলসমৃদ্ধ প্রদেশ খুজস্তান দখলের মাধ্যমে ইরাকের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী এবং ইরানকে সামরিকভাবে দুর্বল করতে চেয়েছিলো। সাদ্দাম হোসেন দুই দেশের (ইরাক ও ইরান) মধ্যবর্তী জলপথ 'শাত আল-আরব'-এর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়ার আকাঙ্ক্ষা ছিলো যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ। ১৯৭৫ সালের আলজিয়ার্স চুক্তিতে এই জলপথের কর্তৃত্ব ভাগাভাগি হলেও, ইরাক পরবর্তীতে এর ওপর একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলো। আর, সৌদি আরব ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় সরাসরি ইরাককে ব্যাপক সহযোগিতা করেছিলো। যদিও শুরুতে সৌদি আরব নিরপেক্ষতা ঘোষণা করেছিলো, কিন্তু ইরানি বিপ্লবের আদর্শ ছড়িয়ে পড়ার ভয়ে তারা সাদ্দাম হোসেনের পক্ষ নেয়। এ ঘটনাটি ইরানের মনে সৌদি আরবের প্রতি গভীর ক্ষোভ ও দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাস সৃষ্টি করে।

হজ ও মক্কা হত্যাকাণ্ড (১৯৮৭): ১৯৮৭ সালে হজের সময় মক্কায় ইরানি হাজিদের সঙ্গে সৌদি নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। এই সংঘর্ষে শতো শতো ইরানি হাজি নিহত হয়। এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় তেহরানে ক্ষুব্ধ জনতা সৌদি দূতাবাসে হামলা চালায়। এর ফলে সৌদি আরব ইরানের সাথে সব ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিত্রতা: ইসলামী বিপ্লবের পর ইরান স্পষ্টভাবে আমেরিকা বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করে। অন্যদিকে সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান আঞ্চলিক মিত্র হিসেবে পরিচিত। ইরান মনে করে সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করছে, যা তাদের নিরাপত্তা ও প্রভাবের জন্য হুমকি।

প্রক্সি যুদ্ধের বিস্তার: ২০০৩ সালে ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর সেখানে ইরানের প্রভাব দ্রুত বাড়তে থাকে, যা সৌদি আরবকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। পরবর্তী সময়ে সিরিয়া, লেবানন এবং বিশেষ করে ইয়েমেনে বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সমর্থন দেয়ার মাধ্যমে দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের প্রতি ইরানের সমর্থন এই শত্রুতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

[] ইরান যদি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হয় তাহলে কি আমেরিকা ভয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তার সব ঘাঁটি সরাবে? না, এমনটা ঘটে না। ইতিহাস বলে, উত্তর কোরিয়া বা রাশিয়া পারমাণবিক শক্তিধর হওয়া সত্ত্বেও আমেরিকা ওই অঞ্চলগুলো থেকে তার সামরিক উপস্থিতি সরায়নি। বরং ইরান শক্তিশালী হলে আমেরিকা তার মিত্রদের (যেমন: সৌদি আরব, ইউএই) রক্ষার অজুহাতে ওই অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি আরও বৃদ্ধি করতে পারে এবং আরও উন্নত অস্ত্র মোতায়েন করতে পারে।

ইসরায়েলের অবস্থান: ইরান পারমাণবিক বোমা বানালে তা সরাসরি বা সাথে সাথেই ইসরায়েলের ওপর ফেলবে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সামরিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। তবে অধিকাংশের মতে, এটি ঘটার সম্ভাবনা কম। এর পেছনে প্রধান কারণগুলো হলো:

পারস্পরিক ধ্বংসের ভয় (MAD): ইসরায়েল নিজে একটি অঘোষিত পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। ইরান যদি হামলা চালায়, তবে ইসরায়েল বা তার মিত্র দেশগুলো (যেমন যুক্তরাষ্ট্র) পাল্টা পারমাণবিক হামলা চালালে ইরানও মানচিত্র থেকে মুছে যেতে পারে।

প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ডিটারেন্স (Deterrence): অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, ইরান বোমা বানালে তা মূলত নিজেদের সুরক্ষার জন্য বানাবে, যাতে কেউ তাদের ওপর হামলা করার সাহস না পায় (যেমনটা উত্তর কোরিয়া করেছে)।

আঞ্চলিক ও পরিবেশগত বিপর্যয়: ইসরায়েলের ওপর পারমাণবিক হামলা চালালে তার তেজস্ক্রিয়তা পুরো মধ্যপ্রাচ্য, এমনকি ইরানের ওপরও ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা ওই অঞ্চলের মুসলিম দেশগুলোকেও বিপদে ফেলবে।

ইরানের দাপ্তরিক অবস্থান: ইরান সবসময় দাবি করে আসছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল শান্তিপূর্ণ কাজের (বিদ্যুৎ উৎপাদন, চিকিৎসা) জন্য। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনেইয়ের একটি ধর্মীয় ফতোয়াও রয়েছে, যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি ও ব্যবহারকে নিষিদ্ধ (হারাম) বলে ঘোষণা করে।

ইসরায়েলের প্রতিরোধমূলক হামলা: ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র বারবার বলেছে যে তারা ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক বোমা বানাতে দেবে না। প্রয়োজনে তারা আগেই ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে সামরিক হামলা চালিয়ে তা ধ্বংস করে দেবে।

পারমাণবিক ইরান ইসরায়েলের জন্য একটি "অস্তিত্ব রক্ষার সংকট" (Existential Threat)। এতে ইসরায়েল সামরিকভাবে চাপে পড়লেও তারা পুরোপুরি দুর্বল হয়ে যাবে এমনটা ভাবা কঠিন। বরং ইসরায়েল ও আমেরিকার সামরিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হবে এবং তারা ইরানকে ঠেকানোর জন্য আরও মরিয়া হয়ে উঠবে।

সুন্নিদের জন্য চ্যালেঞ্জ: অনেক সুন্নি রাষ্ট্র (বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো) ইরানকে তাদের নিরাপত্তার জন্য বড়ো হুমকি মনে করে। ইরান শক্তিশালী হলে আরব দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হয় আমেরিকার ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হবে, অথবা তারাও পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর প্রতিযোগিতায় নামবে (যেমন সৌদি আরব ইঙ্গিত দিয়েছে)।

শিয়াদের জন্য প্রভাব: শিয়া প্রধান দেশ বা গোষ্ঠীগুলোর (যেমন হিজবুল্লাহ, ইরাকের শিয়া গোষ্ঠী) মনোবল ও রাজনৈতিক প্রভাব অনেক বাড়বে।

[] ফিলিস্তিন ইস্যু: ইরান পারমাণবিক শক্তিধর হলে হয়তো আঞ্চলিক রাজনীতিতে আরও শক্তিশালী অবস্থান পাবে। এর ফলে তারা ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে আরও জোরালো সমর্থন দিতে পারবে, যা ইসরায়েলের ওপর চাপ বাড়িয়ে ফিলিস্তিন ইস্যু বা সীমানা নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু ফিলিস্তিনের মুক্তি কেবল বাইরের কোনো শক্তির ওপর নির্ভর করে না; এটি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমর্থন এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধানের বিষয়। ইরানের শক্তিবৃদ্ধি ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করলেও, তা সরাসরি ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক আছে।

[] শিয়া-সুন্নির Balance of Power কি সমাধান? যদি ইরান পারমাণবিক বোমা বানায়, তখন সৌদি আরব ভয়ে তাদেরও পারমাণবিক বোমা বানাতে পারে। তখন কি তা ইরানের জন্যও ভালো কারণ তারা আমেরিকা ও ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারবে, আর এদিকে সৌদি আরব বোমা বানাবে তাদের নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থে। ফলে তাদেরও সুবিধা হবে, কিন্তু ইরান ও সৌদি আরব কেউ একে অপরকে হামলা করবে না।

সবার কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে কেউ কাউকে আক্রমণ করবে না (যাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে 'মিউচুয়াল অ্যাসিউরড ডেস্ট্রাকশন' বা MAD বলা হয়), ফলে একটি স্থিতিশীলতা আসবে। তবে বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে এর কিছু ভিন্ন এবং ঝুঁকিপূর্ণ দিকও রয়েছে।

অস্ত্র প্রতিযোগিতার ঝুঁকি: ইরান পারমাণবিক বোমা বানালে সৌদি আরব, তুরস্ক বা মিশরের মতো সুন্নি দেশগুলোও নিজেদের নিরাপত্তার জন্য একই পথে হাঁটতে পারে। এর ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য একটি পারমাণবিক বারুদের স্তূপে পরিণত হতে পারে, যেখানে ছোটো কোনো ভুল বোঝাবুঝি থেকেও বড়ো ধরনের বিপর্যয় ঘটার ভয় থাকে।

ছায়াযুদ্ধের তীব্রতা (Proxy Wars): সরাসরি পারমাণবিক যুদ্ধ না হলেও, দেশগুলো তখন পারমাণবিক শক্তির ছায়ায় থেকে একে অপরের বিরুদ্ধে আরও বেশি পরোক্ষ যুদ্ধে (Proxy War) লিপ্ত হতে পারে। এতে ইরাক, সিরিয়া, লেবানন বা ইয়েমেনের মতো দেশগুলোতে সংঘাত কমবে না, বরং বাড়তে পারে।

শিয়া-সুন্নি সম্পর্কের টানাপড়েন: যদিও সরাসরি হামলা নাও হতে পারে, তবুও পারমাণবিক সক্ষমতা ইরানকে আঞ্চলিক রাজনীতিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ দেবে। অনেক সুন্নি রাষ্ট্র একে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর হুমকি মনে করে, যা মুসলিম বিশ্বের মধ্যে অনৈক্য আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

[] ইরান তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য কী করতে পারে?

প্রতিরক্ষামূলক শক্তি বৃদ্ধি: ইরান মনে করে, ড্রোন প্রযুক্তি, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের শক্তিশালী করার মাধ্যমে তারা একটি প্রতিরক্ষামূলক ঢাল তৈরি করতে পেরেছে। এটি সরাসরি পারমাণবিক যুদ্ধ ছাড়াই তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাহায্য করে।

আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোট: মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে (বিশেষ করে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে) যদি একটি যৌথ নিরাপত্তা ফ্রন্ট গড়ে ওঠে, তবে শিয়া বা সুন্নি কোনো পক্ষকেই বাইরের শক্তির (যেমন আমেরিকা বা ইসরায়েল) ওপর নির্ভর করতে হবে না। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় ইরান-সৌদি সম্পর্ক পুনঃস্থাপন এই পথে একটি বড়ো পদক্ষেপ ছিলো।

অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা: শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হওয়া যেকোনো গোষ্ঠীর অস্তিত্ব রক্ষার প্রধান হাতিয়ার। ইরান যদি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে উঠতে পারে, তবে তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব আরও টেকসই হবে।

কূটনৈতিক ভারসাম্য: ইরানের জন্য বড়ো চ্যালেঞ্জ হলো পশ্চিমা বিশ্বের সাথে একটি টেকসই সমঝোতায় আসা (যেমন— পারমাণবিক চুক্তি বা JCPOA)। এটি সফল হলে ইরান একদিকে তার পারমাণবিক অধিকার বজায় রাখতে পারবে, আবার যুদ্ধের ঝুঁকিও কমিয়ে আনতে পারবে।

অভ্যন্তরীণ ঐক্য: শিয়া ও সুন্নি সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্যমান ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে ওলামা ও রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ধর্মতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক সংলাপ অপরিহার্য। শত্রু হিসেবে নয়, বরং প্রতিযোগী হিসেবে একে অপরকে সম্মান করলে বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপ করার সুযোগ কমে যায়।

Comments

Popular posts from this blog

অলৌকিক ঘটনা কি কেবল নবি রসূলদের সাথেই ঘটে?

দার্শনিক নানা বিষয় একত্রে :

আল্লাহ এমনভাবে করেন যাতে অনেকে বিশ্বাস করে এবং অনেকে সন্দেও করে। বুঝতে হলে ধৈর্য ধরে জানতে হবে।