(ফেরেশতা), নবী, সাহাবি, তাবেঈন, তাবে-তাবেঈন, মুজাদ্দিদ এবং অন্যান্য নেককার বান্দাদের ছোটোখাটো ও অনিচ্ছাকৃত ভুল :
(ফেরেশতা), নবী, সাহাবি, তাবেঈন, তাবে-তাবেঈন, মুজাদ্দিদ এবং অন্যান্য নেককার বান্দাদের ছোটোখাটো ও অনিচ্ছাকৃত ভুল :
আল্লাহ তাআলা ছাড়া কোনো সৃষ্টিই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। তবে "ভুল করতে পারেন" আর "অনেক ভুল করেন" — এই দুটি কথা এক নয়। আবার ভুল, অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি, ইজতিহাদি ভুল, তানবিহ এবং গুনাহও একই বিষয় নয়।
তাই কোনো মর্যাদাবান ব্যক্তি বা নেককার বান্দার জীবনে কোনো ছোটোখাটো, অনিচ্ছাকৃত বা ইজতিহাদি ভুল পাওয়া গেলে, শুধু সেই একটি ঘটনা দিয়ে তাঁর সামগ্রিক চরিত্র, ঈমান, তাকওয়া বা মর্যাদা বিচার করা ঠিক নয়।
[] আল্লাহ :
আল্লাহ তাআলা কোনো রকম ভুল করেন না। তাঁর জ্ঞান, প্রজ্ঞা, ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত পরিপূর্ণ। তাই আল্লাহর ক্ষেত্রে ভুল, অজ্ঞতা বা অনিচ্ছাকৃত ত্রুটির কোনো প্রশ্নই আসে না।
[] ফেরেশতা :
ফেরেশতারা আল্লাহর অবাধ্য হন না। তাঁরা আল্লাহর নির্দেশ পালন করেন।
তবে ফেরেশতাদের সম্পর্কে কিছু ঘটনা নিয়ে তাফসির ও ইতিহাসের গ্রন্থে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। এর মধ্যে হারূত ও মারূত-এর ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
সূরা আল-বাকারা ২:১০২-এ হারূত ও মারূতের উল্লেখ আছে। কিছু তাফসিরি বর্ণনায় এসেছে যে, তাঁরা মানুষের গুনাহ দেখে মনে করেছিলেন — মানুষের ওপর কামনা-বাসনা ও অন্যান্য প্রবৃত্তির চাপ থাকলেও তাঁরা নিজেরা হলে এমন গুনাহ করতেন না অর্থাৎ তাদের ধারণা ভুল ছিলো (এই যে ভুল)। পরে তাঁরা মানুষ হয় এবং তাঁদের পরীক্ষা করা হয় এবং সেই বর্ণনাগুলোতে যিনা, মদ্যপান, হত্যা এবং শেষে কূপে বন্দি হওয়ার মতো ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা আছে: এই বিস্তারিত কাহিনিগুলো কুরআন বা সহিহ হাদিস দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত নয়। এগুলোর অনেক বর্ণনাকে আলেমরা দুর্বল বা ইসরাইলিয়াত হিসেবে আলোচনা করেছেন। তাই এগুলোকে নিশ্চিত আকীদাগত সত্য হিসেবে বলা ঠিক নয়।
অর্থাৎ, হারূত-মারূত সম্পর্কে প্রচলিত এই কাহিনি উল্লেখ করা যেতে পারে "কিছু বর্ণনায় এসেছে" — এই সতর্কতার সঙ্গে; কিন্তু "নিশ্চিতভাবেই দুই ফেরেশতা মানুষ হয়ে যিনা করেছিলো এবং কূপে বন্দি হয়েছিলো" — এভাবে নিশ্চিত করে বলা উচিত নয়।
এছাড়া সূরা আল-বাকারা ২:৩০-এ ফেরেশতারা যখন বলেছিলেন, পৃথিবীতে এমন সৃষ্টিকে কেন রাখা হবে যারা সেখানে ফাসাদ করবে ও রক্তপাত করবে, তখন এটিকে আল্লাহর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা বা আল্লাহর জ্ঞানকে ভুল মনে করা হিসেবে বোঝা উচিত নয়। তাঁরা আল্লাহর হিকমত সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন এবং আল্লাহ তাঁদের সামনে নিজের জ্ঞানের বিষয়টি প্রকাশ করেন।
[] নবী-রাসূল :
নবী-রাসূলগণ আল্লাহর মনোনীত ও বিশেষভাবে সংরক্ষিত বান্দা। তাঁরা সাধারণ মানুষের মতো গুনাহে ডুবে থাকা মানুষ ছিলেন না। বিশেষ করে ওহি গ্রহণ ও আল্লাহর দ্বীন মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে আল্লাহ তাঁদের সংরক্ষণ করেছেন।
তবে কুরআনে এমন কিছু ঘটনা রয়েছে যেখানে কোনো নবীর পক্ষ থেকে অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি, মানবীয় দুর্বলতা বা এমন কোনো কাজ সংঘটিত হয়েছে, যার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা তাঁদের সংশোধন বা তানবিহ করেছেন।
> আদম (আ.) :
আদম (আ.) নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়েছিলেন। কুরআনে তাঁর এই ঘটনা উল্লেখ আছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে তিনি সাধারণ মানুষের মতো পাপে অভ্যস্ত ছিলেন বা অনেক গুনাহ করতেন। তিনি ভুলের পর আল্লাহর কাছে তওবা করেন এবং আল্লাহ তাঁর তওবা কবুল করেন।
> ইউনুস (আ.) :
ইউনুস (আ.) তাঁর জাতির ব্যাপারে আল্লাহর নির্দেশের পূর্ণতা আসার আগেই চলে গিয়েছিলেন। পরে তিনি বিপদের সম্মুখীন হন এবং মাছের পেটে থেকে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। আল্লাহ তাঁকে উদ্ধার করেন।
তাই নবীদের জীবনে এমন ঘটনা থাকা মানে এই নয় যে তাঁরা "অনেক ভুল করতেন"। বরং তাঁরা আল্লাহর নির্বাচিত বান্দা ছিলেন; তাঁদের কোনো ত্রুটি হলে আল্লাহ তাঁদের সংশোধন করেছেন।
অতএব, নবীদের কোনো ত্রুটি বা তানবিহের ঘটনা থাকা আর তাঁদেরকে সাধারণ অর্থে "অনেক ভুলকারী" বলা — দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
[] সাহাবায়ে কেরাম :
সাহাবায়ে কেরাম নবী নন। তাই তাঁরা নিষ্পাপও নন। তাঁদের কারও দ্বারা ভুল বা গুনাহ সংঘটিত হতে পারে।
হাদিস ও ইতিহাসে এমন সাহাবির ঘটনাও পাওয়া যায়, যাঁদের দ্বারা কোনো গুনাহ সংঘটিত হয়েছিলো এবং পরে তাঁরা তওবা করেছেন বা শরিয়তের বিধান অনুযায়ী শাস্তি গ্রহণ করেছেন। এমনকি কিছু সাহাবির দ্বারা ব্যভিচার/যিনার মতো বড়ো গুনাহ সংঘটিত হওয়ার ঘটনাও সহিহ হাদিসে পাওয়া যায়।
কিন্তু একজন সাহাবির জীবনে একটি গুনাহ সংঘটিত হওয়া মানেই তিনি "অনেক ভুল করতেন" — এমন নয়। তাঁর পুরো জীবন, ঈমান, ত্যাগ, নবীর সাহচর্য, আমল ও তওবা —সবকিছু বিবেচনা করতে হবে।
> আলী (রা.) :
আলী (রা.)-এর ব্যাপারেও কিছু মানুষের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া এবং তাদের আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এ ঘটনার বিভিন্ন বর্ণনা ও ব্যাখ্যা রয়েছে। তাই এটিকে সরলভাবে "আলী (রা.) অনেক ভুল করতেন" বলার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক নয়।
বরং এখান থেকেও বোঝা যায় — একজন মহান সাহাবির জীবনে কোনো ঘটনা বা সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা থাকলেও তা দিয়ে তাঁর পুরো জীবনকে "ভুলে ভরা" বলা যায় না।
সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। তাঁদের মধ্যে বহু সাহাবি জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছেন এবং কুরআন-সুন্নাহ তাঁদের সামগ্রিক মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে।
[] তাবেঈন :
তাবেঈনগণ ইসলামের শ্রেষ্ঠ প্রজন্মগুলোর অন্যতম। তাঁরা সাহাবায়ে কেরামের কাছ থেকে দ্বীন শিক্ষা লাভ করেছেন।
কিন্তু তাঁরা নবী ছিলেন না। তাই তাঁদেরও ভুল হতে পারে।
কোনো কোনো তাবেঈ বা পরবর্তী নেককার ব্যক্তি কবর জিয়ারত, ইবাদত বা অন্য কোনো বিষয়ে এমন কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেন, যেগুলো পরবর্তী আলেমদের কাছে দলিলের আলোকে ভুল, অতিরঞ্জিত বা বিদআত হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
এর অর্থ এই নয় যে সেই তাবেঈ বা নেককার ব্যক্তি খারাপ ছিলেন। বরং একজন মানুষের কোনো নির্দিষ্ট আমল ভুল হতে পারে, অথচ তিনি সামগ্রিকভাবে আল্লাহভীরু ও নেককার হতে পারেন।
[] তাবে-তাবেঈন :
তাবে-তাবেঈনগণও ইসলামের অত্যন্ত মর্যাদাবান প্রজন্ম।
তাঁরাও নবী ছিলেন না। ফলে তাঁদের ইজতিহাদে ভুল হওয়া সম্ভব।
একজন বড়ো আলেম কোনো একটি মাসআলায় সঠিক ইজতিহাদ করতে পারেন, আবার অন্য কোনো বিষয়ে তাঁর ইজতিহাদ ভুল হতে পারে। এটি ইসলামী জ্ঞানচর্চার স্বাভাবিক বিষয়।
তাই কোনো তাবে-তাবেঈনের একটি ইজতিহাদি ভুল পাওয়া গেলে তাঁর ইলম, তাকওয়া বা সামগ্রিক মর্যাদা অস্বীকার করা উচিত নয়।
[] মুজাদ্দিদ :
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "নিশ্চয়ই আল্লাহ এই উম্মতের জন্য প্রতি একশ বছরের শুরুতে এমন একজনকে (মুজাদ্দিদ) পাঠাবেন, যে তাদের দ্বীনের বিষয়গুলো সংস্কার/পুনর্জীবিত করবে।" — (সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৪২৯১, হাদিসের মান: সহীহ)
এখন কোনো ১০০ বছরে একই সাথে একাধিক বড়ো ইসলামি চিন্তাবিদ থাকে। হাদিসে "একজন" শব্দ আসলেও বাস্তবে অনেক আলেমের ব্যাখ্যায় একই শতাব্দীতে একাধিক মুজাদ্দিদ হওয়া সম্ভব।
মুজাদ্দিদ নবী নন। তাই তাঁকে নিষ্পাপ বা মাসুম মনে করা ঠিক নয়।
কোনো মুজাদ্দিদের কোনো মতামত পরবর্তীতে পরিবর্তিত হতে পারে, কোনো বিষয়ে তাঁর পূর্বের মত সংশোধিত হতে পারে, অথবা তিনি নিজেই পরবর্তী সময়ে অন্য মত গ্রহণ করতে পারেন।
এতে তাঁর মুজাদ্দিদ হওয়ার বিষয়টি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায় না।
কারণ মুজাদ্দিদ হওয়া মানে ভুলহীন হওয়া নয়।
[] নবী, সাহাবি, তাবেঈন, তাবে-তাবেঈন, মুজাদ্দিদ নন —কিন্তু আল্লাহর বিশেষ রহমতপ্রাপ্ত বড়ো নেককার বান্দা :
আল্লাহর ওলী, নেককার বান্দা এবং বিশেষভাবে হিদায়াতপ্রাপ্ত অনেক মানুষও নবী নন। তাই তাঁদের ভুল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
> আসহাবে কাহাফ :
আসহাবে কাহাফ নবী ছিলেন — এমন কোনো সহিহ ও সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই। কুরআন তাঁদের ঈমানদার কয়েকজন যুবক হিসেবে বর্ণনা করেছে, যাঁদের আল্লাহ বিশেষভাবে হিদায়াত ও রহমত দান করেছিলেন।
তাঁদের মর্যাদা অনেক উঁচু হলেও তাঁরা নবী ছিলেন — এ কথা বলা ঠিক নয়।
> মুমিন এক বালক :
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত আছে, এক মুমিন বালক এক জালিম রাজার অধীনে ছিলো। সে এক আল্লাহর ইবাদতে বিশ্বাসী এক সাধকের কাছে ঈমান ও তাওহিদ শিখেছিলো। আল্লাহ তাকে এমন কিছু কারামতসদৃশ ঘটনা দেখানোর ক্ষমতা দেন, যার মাধ্যমে বহু মানুষ সত্যের প্রতি ঈমান আনে। পরে রাজা তাকে ঈমান থেকে ফেরাতে না পেরে হত্যা করে; কিন্তু তার শাহাদাতের পর অসংখ্য মানুষ ঈমান গ্রহণ করে।
তবে সেই বালক নবী ছিলো — এমন কোনো সহিহ প্রমাণ নেই। বরং ঘটনাটি দেখায়, আল্লাহ চাইলে একজন সাধারণ মুমিন বান্দার মাধ্যমেও অসাধারণ নিদর্শন প্রকাশ করতে পারেন।
>> এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো:
কারও হাতে অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ পাওয়া মানেই সে নবী নয়।
নবুয়ত আল্লাহর বিশেষ নির্বাচন। কোনো নেককার বান্দার মাধ্যমে কারামত প্রকাশিত হতে পারে, কিন্তু কারামত নবুয়তের প্রমাণ নয়।
তাই আল্লাহর বিশেষ রহমতপ্রাপ্ত একজন নেককার বান্দারও কোনো ভুল হতে পারে। তাঁর কোনো ভুল থাকা তাঁর নেককারিতা সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করার কারণ নয়।
> সূরা আলে ইমরানে উল্লেখিত 'ইমরান' কি নবী ছিলেন—এমন কোনো সহিহ ও সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই।
ইমরান (মরিয়ম আ.-এর পিতা) ছিলেন একজন নেককার ও সম্মানিত ব্যক্তি; তাঁর পরিবারকে আল্লাহ বিশেষভাবে মনোনীত করেছিলেন।
[] একজন নেককার নেতা — ইমাম মাহদি :
ইমাম মাহদি নবী নন। তাঁকে নিষ্পাপ বা মাসুম বলারও কোনো ভিত্তি নেই।
তাই নীতিগতভাবে তাঁর ভুল করার সম্ভাবনা রয়েছে।
>> কিন্তু এখানেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো:
"তিনি ভুল করতে পারেন" মানেই "তিনি প্রচুর ভুল করবেন" — এটা নয়।
একজন ব্যক্তি ভুল করার ক্ষমতা রাখেন — এটি মানবীয় বৈশিষ্ট্য। কিন্তু তিনি স্বভাবগতভাবে অনেক ভুলকারী হবেন, এমন সিদ্ধান্ত সেখান থেকে আসে না।
বরং ইমাম মাহদি সম্পর্কে বর্ণিত হাদিসগুলোতে তাঁর ন্যায়বিচার ও সঠিক নেতৃত্বের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
Comments
Post a Comment